সমকামিতা আর এই ঘুণে ধরা সমাজের কিছু প্রশ্ন, পর্ব -২

পর্ব ১ এ আলোচনা করেছিলাম সমাজের থেকে উঠে আসা প্রথম সারির প্রশ্ন, স্বাভাবিক ভাবে জীবন যাপনের দৈনন্দিন জীবনে আরও অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় । মাঝে মাঝে মন খারাপ হয় আবার মাঝে মাঝে অনেক হাসিও পায়। হাসি পায় কারণ যতই সাবলীল ভাবে প্রশ্নের উত্তর দেই না কেন, উত্তরগুলো এই সমাজের মানুষগুলোর কাছে ঠিক যুতসই হয় না। কারণ আমাদের উত্তর গুলোকে মানতে হলে এতদিনকার এই সমাজ ব্যাবস্থার অযৌক্তিক নিয়ম গুলো ভাঙ্গতে হবে। আর নিয়ন ভাঙ্গলে মানুষকে তখন আর অযৌক্তিক ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। প্রশ্নপর্বে ফিরে আসি-

১) সমকামিতা থাকলে জনসংখ্যা কমে যাবে এবং মানুষের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে।

উত্তরঃ

ইউরোপের জনসংখ্যা কম বা কমে যাওয়ার কারণ হল সামাজিক এবং অর্থনৈতিক। কতভাগ মানুষ সেখানে সমকামিতার জন্যে জনসংখ্যা কমাচ্ছে? পৃথিবীর জনসংখ্যা এক মিলিয়ন থেকে ডাবল হতে যে সময় নিয়েছিল, এখন চার থেকে আট বিলিয়ন হতে তার এক চতুর্থাংশ সময় নিচ্ছে। তাই জনসংখ্যা নিয়ে চিন্তিত হবার কিছু নাই। অন্যদিকে প্রকৃতিতে সাড়ে তিন হাজারেরও অধিক প্রজাতির মধ্যে সমকামিতা আছে কিন্তু তারা তো নিশ্চিহ্ন হচ্ছে না। কারণ, জনসংখ্যা বাড়ানোর জন্য বিষমকামীরা তো থাকছেই।

 ২) সমকামীরা বিয়ে করলে পরিবার ধ্বংসের মুখে পড়ে যাবে।

উত্তরঃ

এই কথাটা সর্বৈব মিথ্যা। কারণ, সমকামীদের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ কম। এরা দত্তক নিয়ে সন্তানদের যে ভালবাসা দিয়ে গড়ে তুলছে, গবেষণায় দেখা যায় তা বিষমকামীদের তুলনায় অনেক বেশি মজবুত পরিবার তৈরি করে।

৩) সমকামিতাকে উস্কে দিলে অনাচার বেড়ে যাবে।

উত্তরঃ 

সামাজিক ক্ষেত্রে অনাচারীর সংখ্যা কি কম? ছেলে এবং মেয়ের বিয়ের মধ্যে কি অনাচার হয় না? বরং গবেষণা বলে সমকামী যুগল অনেক বেশি বিশ্বস্ত থাকে নিজ নিজ পার্টনারের প্রতি।

আরেকটা কথা, সমকামীরা প্রকৃতিগতভাবে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ বোধ করে না। এদের জোর করে বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গে বিয়ে দিলে আরও বড় অনাচার করা হয়। কারণ তাতে দুটো জীবন নষ্ট হয়ে যায়। তাছাড়া যা অনাচার, তাকে সমর্থন না দিয়েই তো সামাজিক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

৪) অনেক যুক্তির ভিড়ে শিক্ষিত, আধাশিক্ষিত, ডাক্তার, উকিল, এমনকি বায়োলজিক্যাল সায়েন্সের মানুষের কাছে যে কমন প্রশ্নটি বা মন্তব্যটি এলো তা হল “সমকামিতা নিষিদ্ধ করা হয়েছে কারণ এটা সমাজ ও স্বাস্থ্যের জন্যে ভাল না। দেখুন এতে এইডস হয়, এনাল ক্যান্সার হয় ইত্যাদি ইত্যাদি।”

উত্তরঃ 

আমার খুব সাধারণ একটা প্রশ্ন – পৃথিবীতে যে বছরে ৫৬ মিলিয়ন লোক মারা যায় ( ১ মিলিয়ন = ১০ লাখ), এর মধ্যে প্রথম দশটি কারণ কী কী? (ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন, ২০১৪)

১। হৃদরোগ, সাড়ে ৭ মিলিয়ন – মূল কারণ ধূমপান, খাদ্যাভ্যাস

২। স্ট্রোক – প্রায় সাত মিলিয়ন – মূল কারণ উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপান

৩। সি ও পি ডি, ফুসফুসের রোগ – প্রায় তিন মিলিয়ন – মূল কারণ ধূমপান

৪। নিচের শ্বাসপ্রণালীর ইনফেকশন – তিন মিলিয়ন, মূলত শিশু এবং বৃদ্ধরা মারা যায় – মূল কারণ অপুষ্টি, দারিদ্র

৫। শ্বাসতন্ত্রের ক্যান্সার – এক দশমিক ছয় মিলিয়ন- মূল কারণ ধূমপান

৬। ডায়রিয়া – দেড় মিলিয়ন, মূলত শিশুরা, মূল কারণ অপুষ্টি, দারিদ্র

৭। ডায়াবেটিস – দেড় মিলিয়ন মূল কারণ জিনেটিক, খাদ্যাভ্যাস, স্থূলতা

৮। এইচআইভি – এইডস, দেড় মিলিয়ন- মূল কারণ কনডম ছাড়া সেক্স (সম বা বিষমকামী) , নিডল শেয়ার করে ড্রাগ নেয়া, দরিদ্র দেশে রক্ত বিক্রি

৯। সড়ক দূর্ঘটনা – ১ দশমিক তিন মিলিয়ন – কারণ আপনারা জানেন

১০ । উচ্চ রক্তচাপ – এক মিলিয়নের একটু বেশি – মূল কারণ – স্ট্রেস, জিনেটিক, অন্যান্য রোগ, অতিরিক্ত মদ খাওয়া

এই তথ্যগুলো থেকে সত্যটা জানতে কারো রকেট সায়েন্টিস্ট হবার দরকার নেই। এখানে বড় বড় রোগের মূল কারণ ধরলে ধূমপান এক নম্বরে। এইচআইভি এইডস হলো অষ্টম নম্বরে (ছয়ও বলা যায়) আর কারণ হিসাবে সমকামিতাকে ধরলে সম্ভবত সর্বনিম্ন কারণ। তাহলে যিনিই নিষিদ্ধ করে থাকেন তিনি মানুষের মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে জানেন না? তাহলে তো সবচেয়ে আগে ধূমপানকে নিষিদ্ধ করা হতো। বাংলাদেশের এইসব মহা সমাজ সচেতন এবং স্বাস্থ্য সচেতন মানুষগুলো কি কেউ ধূমপান করলে এতোটা রি রি রা রা ভাব নিয়ে এগিয়ে আসেন? সর্বজ্ঞানী ঈশ্বরও কি জানতেন না যে, ধূমপান বেশি মানুষকে মারবে সমকামিতার চেয়ে?

এর অর্থ এই না আমি সবাইকে সমকামী হতে বলছি। বিজ্ঞান মানেই হল নৈর্ব্যক্তিকভাবে দেখা। যার যার অবস্থানে তাদেরকে নন-জাজমেন্টালভাবে দেখা (যাকে বলে প্রোভিনশিয়ালিস্টভাবে না দেখা) । বিজ্ঞানের “ব”ও যদি কেউ বোঝে তাহলে স্বাস্থ্যের দোহাই দিয়ে এদেরকে ঘৃণা করতে বলবে না। অন্তত স্বাস্থ্য শাখার কোন প্রফেশনালের তো একদমই উচিত না। জগতের সকলে সংস্কারমুক্ত হোক, মঙ্গল হোক সবার।

সব শেষে বলবো, আমার দীর্ঘ গবেষণা, শিক্ষকতার জীবনে এমনকি বাংলাদেশের ধর্মময় জীবনেও অনেককে দেখেছি সামাজিকভাবে কতটা নিগৃহীত হতে। অথচ মানুষ হিসাবেও সমকামীরা অনেক উন্নত মনের। মানুষের প্রতি মমতা, ভালবাসা নিয়ে দেখা শুরু করলে আমাদের এই বিশ্রী গালিগালাজ বন্ধ হতে বাধ্য। আমি কিছু বিশ্বাস করি বলেই আমি শ্রেষ্ঠ আর অন্যেরা না, এমন মনোভাব থেকেও মুক্তি পাওয়া দরকার। এজন্যেই বলা হয়, মানুষ মানুষের জন্যে। কেউ প্রকৃতিগতভাবে ভিন্ন হলে তাকে অবজ্ঞা, ঘৃণা নয় বরং সামাজিকভাবে গ্রহণের হাত বাড়িয়ে দেয়ার নামই মানবতা।

আমরা সমকামীরাও আপনাদের মত সাধারণ মানুষ। আপনারা যেভাবে দৈনন্দিন জীবন যাপন করেন, ঘর সামলান, পরিবার নিয়ে সুখে থাকছেন, জানেন আমরাও ঠিক আপনাদেরই মতন সাধারণ স্বাভাবিক মানুষ। আপনাদের যদি  স্বাভাবিক ভাবে বেঁচে থাকার অধিকার থাকে, আমাদেরও তো সেই একই স্বাভাবিক ভাবে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। সবার আগে আমরা মানুষ তো! আমাদের বেঁচে থাকার অধিকার আছে কি নেই সেটা না হয় আমাদের উপর ছেড়ে দিন?  

Sultanul Arefin Siam

সুলতানুল আরেফিন সিয়াম। ব্লগার, লেখক ও সমকামী অধিকার কর্মী। একই সাথে তিনি বয়েজ লাভ ওয়ার্ল্ড, এথিস্ট ইন বাংলাদেশ, এথিস্ট চ্যাপ্টার, ডেইলি এথিস্ট, সেক্যুলার বাংলাদেশ ও এলজিবিটি বাংলাদেশ নামক পাব্লিক ব্লগ ও ম্যাগাজিনগুলোর সাথে জড়িত রয়েছেন। তাছাড়া তাঁর ব্যক্তিগত ব্লগেও নিয়মিত লেখালেখি করে থাকেন।

Read Next

সমকামিতা আর এই ঘুণে ধরা সমাজের কিছু প্রশ্ন, পর্ব -১

Leave a Reply

Your email address will not be published.